তুরস্ক বনাম তালেবান

    মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি কারিগরি দল শুক্রবার আঙ্কারায় বৈঠক করেছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে আফগানিস্তান নিয়ে। সেখান থেকে ন্যাটো সেনারা চলে গেলে, কাবুল হামিদ কারজাই বিমানবন্দরের দায়িত্ব নেবে তুরস্ক।

    এক্ষেত্রে তুরস্কের কঠিন কতোগুলো শর্ত আছে। এ বৈঠকে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি এ বিষয়ে। তবে আগামীতে এমন আরো বৈঠক চালিয়ে যেতে এক মত হয়েছে উভয় পক্ষ।

    তুরস্ক কাবুল বিমান বন্দরের দায়িত্ব নেয়ার বিষয়টিকে ব্যবহার করে আমেরিকার সাথে সম্পর্কে নতুন করে গতি আনতে চাইছে। কিন্তু আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ ক্ষমতা যাদের হাতে যাবে, সেই তালেবান ন্যাটোর ছত্রছায়ায় সেদেশে তুরস্কের থাকার বিরোধিতা করছে।

    তুরস্ক তালেবানের সাথেও ব্যাকচ্যানেল বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে তালেবানের সাথেও সমঝোতায় পৌঁছতে চায় আঙ্কারা। কিন্তু তালেবান এখন বিজয় উল্লাসে মাতোয়ারা! ২০ বছর পরে আবারো মসনদে বসার স্বপ্নপূরণ হতে চলছে।

    তাই, কারো সাথেই লিয়াজোঁ করতে চাইছে না। এমনকি পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও রাখঢাক না করে পরশু বলেদিলেন: তালেবান এখন বিজয় উল্লাসে এতোটাই মাতোয়ারা যে, পাকিস্তানের সাথেও তালেবানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে – আমি নিশ্চিত না।

    তালেবানের ওপর পাকিস্তানের এখন আর তেমন প্রভাব নেই। বিশেষ করে, কোনো সমঝোতা ছাড়াই মার্কিনীদের আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ায়। ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে একটি গৃহযুদ্ধের আশংকাও রয়েছে।

    পাক সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া বৃহস্পতিবার তুরস্ক সফর করেছেন। তিনিও কাবুল বিমানবন্দরের বিষয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকারের সাথে আলোচনা করেছেন।

    হুলুসি অবশ্য ঘোষণা দিয়েছেন যে, এ মুহূর্তে আফগানিস্তানে নতুন করে তুরস্কের সেনা পাঠানোর কোনো সম্ভবনা নেই। বর্তমানে তাদের যে ৫০০ সেনা কাবুলে মোতায়েন আছে, তারাই হামিদ কারজাই বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় যথেষ্ট। তবে বিষয়টি সংখ্যা নয়।

    আসল বিষয় হলো – তুর্কি সেনারা কী উদ্দেশ্যে থাকবে এবং দায়িত্বের পরিধি কী হবে? এক্ষেত্রে তালেবানের সাথে লিয়াজোঁ কীভাবে হবে? কেননা, তালেবান, তুরস্কের আর কোনো নতুন সেনা পাঠানো তো দূরের কথা – তারা বর্তমানে সেখানে মোতায়েন করা সব সেনা ফেরত নিতে বলেছে।

    আমি যতোদূর জানি, তুরস্ক এক্ষেত্রে তালেবানের সাথে বৈঠক করছে। গত দু সপ্তাহে অনেকবার বৈঠক হয়েছে। তালেবানও তাদের কথার সুর কিছুটা নরম করেছে। তারা বলেছে, তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্র। আমরা তুরস্কের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে চাই। তুরস্কের সাথে ভবিষ্যতে সম্পর্ক আরো উন্নত করতে চাই।

    তালেবানের এ পজিটিভ মেসেজটি ভবিষ্যতে কতোটুকু সুফল নিয়ে আসে, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। তালেবানের একজন মুখপাত্র অবশ্য আমাকে জানান, বিদেশী সেনা থাকার বিষয়ে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট। তবে তিনি তুরস্কের সাথে তালেবানের বিভিন্ন চ্যানেলে যোগাযোগ হচ্ছে বলেও স্বীকার করেন। তার মতে, এ বিষয়ে আগামী পাঁচ সাত দিনের মাঝে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে।

    আমার ধারণা, তুরস্ক ও তালেবান একটা সমঝোতায় আসবে। তবে সময় লাগবে। আর সমঝোতায় না এলে, তুরস্ক কি ওখানে থাকার জন্যে তালেবানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে? এখনই বলা মুশকিল। তবে ওখানে আফগানিস্তানের উত্তর অঞ্চলে তুর্কি বংশোদ্ভূত তাজিক, তুর্কমেন ও উজবেক জনগণ আছে – যাদের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক ভালো।

    তালিবানের বিজয় উল্লাসে মৃত্যুর মিছিল: কাবুল বিমানবন্দর নিয়ে যখন বিশ্বের বড় বড় দেশ তাদের মতো করে পরিকল্পনা করছে, তখন আফগানিস্তানের ভিতরে ক্ষমতার পরিবর্তন হচ্ছে ঝড়ের গতিতে!

    তালেবান প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। কোথাও যুদ্ধ করে, কোথাওবা স্বেচ্ছায় সরকারি বাহিনী ছেড়ে যাচ্ছে এলাকাগুলো। আফগানিস্তানের প্রায় ৭৫% এখন তালেবানের দখলে। পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় সবগুলোই এখন তালেবানের দখলে।

    তারা পৌঁছে গেছে কাবুলের উপকণ্ঠে। অপেক্ষা করছে সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখের জন্যে। সেই দিনটি মার্কিন সেনাদের আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার শেষ দিন। দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতার হস্তান্তরের কোনো সম্ভবনা নেই।

    প্রতিদিনই বাড়ছে হামলা আক্রমণের সংখ্যা। এতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হার বেড়েছে কয়েকশো গুণ! সরকার এখন প্রায় একেজো, অচল ও নিষ্ক্রিয়। তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই দেশটির উপরে।

    দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিরাপত্তা রক্ষায় যে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিলো – তারাও তালেবান আক্রমণে দিশেহারা! কাবুল থেকে স্পষ্ট কোনো দিক নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে না তাদেরকে। সরকারের প্রধানরা এখন নিজেদের নিরাপদ প্রস্থানের পথ খুঁজছেন। তালেবান খুব শীঘ্রই ক্ষমতা দখল করবে। কিন্তু আফগানিস্তানে এখন নতুন এক গৃহযুদ্ধের দ্বার প্রান্তে!

    এ অবস্থায় তুরস্ক কি তালেবানের সাথে যুদ্ধে জড়াবে? আমি এর আগের লেখায়ও তুরস্কের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখির ধরণ দেখে মনে হয় ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। তাহলে আরো একটু খোলাসা করে বলি –

    তুরস্কের আফগানিস্তানে থাকা নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে তুরস্ক আমেরিকা, ন্যাটো, পাকিস্তান ও তালেবানের সাথে বৈঠক করছে। এখনো অনেক বিষয়ে সমঝোতা হয়নি। হয়তো কয়েকদিনের ভেতরে অনেক কিছুই পুরোপুরি স্পষ্ট হবে।

    তবে একটা বিষয় এখানে পরিষ্কার করা দরকার। তা হলো – তুরস্ক তালেবানের সাথে যুদ্ধে জড়াবে না। তালেবানও তুরস্কের সাথে যুদ্ধে জড়াবে না। কেননা, তুরস্ক ন্যাটোর অংশ হিসেবে গত বিশ বছর ধরে আফগানিস্তানে আছে। ৫০০ সেনা এখনো কাবুলে আছে। তালেবান এ ২০ বছরে একবারও তুর্কি সেনাদের ওপর আক্রমণ করেনি। আর তুরস্কও একবারও তালেবানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেনি।

    ন্যাটো আফগানিস্তানে থাকতেই যে তুরস্ক তালেবানের সাথে যুদ্ধে জড়ায়নি, সেই তুরস্ক এখন একা একা তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে কোন যুক্তিতে? আর তালেবানও তুরস্কের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি দেয়ার বদলে পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়েছে। কেননা, তুরস্কের ওখানে অবস্থান ন্যাটোর সদস্য হিসেবে।