ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’ ইরাকের নুজাবা মুভমেন্ট

দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ইরাকের হারাকাত হিজবুল্লাহ আন-নুজাবা মুভমেন্ট।

সংগঠনটি মুখপাত্র নাসর আশ-শাম্মারি বলেছেন, তাঁরা দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত আছেন।

পার্স টুডে’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাক ও সিরিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে নুজাবা মুভমেন্টের।

দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের গড়ে তোলা প্রতিরোধের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আরব দেশগুলোর যেসব শাসক ইসরাইলের সংগে আপোষ করেছে তাদের প্রতি আমাদের ঘৃণা। তারাও ইসরাইলের অপরাধে সমভাবে অপরাধী।

নাসর আশ-শাম্মরি আরও বলেছেন, ইরাকের জনগণ, বিশেষ করে প্রতিরোধ সংগ্রামীরা ইসরাইলের সংগে সরাসরি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

আরো পড়ুন: যে বাঙালি যোদ্ধার কাছে ধরাশায়ী হয়েছিল ইসরাইল !

প্রয়াত সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাইফুল আলম সুজা। গত এক সপ্তাহ ধরে সংঘাতে লিপ্ত ইসরাইল-ফিলিস্তিন। মূলত দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার পালটা জবাব দিচ্ছে ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। এবারের সংঘাত মূলত রমজান মাসে পবিত্র আল আকসায় মুসল্লিদের নামাজে বাধা দেওয়ার পর থেকে তীব্রতর হয়।

এবার গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইল অভিমুখে এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে হামাস, যার অধিকাংশই আয়রন ডোম প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করেছে ইসরাইল। এদিকে ইসরাইলি বিমান বাহিনীর ছোড়া গোলায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হচ্ছে ফিলিস্তিন।

সমর বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, পালটা বিমান হামলা করা না গেলে ইসরাইল সব সময়ই অপ্রতিরোধ্য। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই স্মরণ করেছেন ১৯৬৭ সালের তৃতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ইতিহাস, যে যুদ্ধে ইসরাইলের যমদূত হয়ে হাজির হয়েছিলেন বাংলাদেশের সেনা কর্মকর্তা সাইফুল আজম সুজা।

সাইফুল আজম পৃথিবীর ইতিহাসের একমাত্র যোদ্ধা যিনি একক ব্যক্তি হিসেবে সর্বোচ্চ সংখ্যক ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। একাই নাকানিচুবানি খাইয়েছিলেন বর্বর ইসরাইলি সেনাদের। এমন কৃতিত্বের জন্য বাংলাদেশের এই বৈমানিককে সে সময় ‘নাত আল-সুজাহ’ সামরিক সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

এই বীর যোদ্ধার সেই গৌরবময় ইতিহাস হয়ত অনেকের অজানা। চলমান ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘর্ষ পরিস্থিতিতে এই যোদ্ধার ১৯৬৭ সালে ইসরাইলকে প্রতিহত করার সেই ইতিহাস পাঠকের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো- পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ১৯৬৭ সালের জুন মাসে তৃতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে অংশ নিতে ইরাকি বিমানবাহিনীতে বদলি হন সাইফুল আজম সুজা।

পশ্চিম ইরাকে অবস্থান নিয়ে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন তিনি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৫ দিনের মাথায় গাজা এবং সিনাইয়ের কর্তৃত্ব নিয়েছিল ইসরাইল। জুনের ৫ তারিখে সিরীয় বিমানবাহিনীর দুই-তৃতীয়াংশ শক্তি ধ্বংস করে দেয় ইসরাইলি বিমান সেনারা। তেমন কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ইসরাইল পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেম তারা দখল করেছিল। দখল করেছিল সিরিয়ার গোলান মালভূমিও।

তাদের সামনে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ তৈরি করতে পারেনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ। এ সময় ইসরাইলিদের যমদূত হয়ে জর্ডানে যান সাইফুল আজম। ৬ জুন আকাশ থেকে প্রচণ্ড আক্রমণে মিসরীয় বিমানবাহিনীর যুদ্ধ-সরঞ্জাম গুঁড়িয়ে দেয় ইসরাইলি বাহিনী। একই দিন বেলা ১২টা ৪৮ মিনিটে চারটি ইসরাইলি সুপারসনিক ‘ডাসল্ট সুপার মিস্টেরে’ জঙ্গি বিমান ধেয়ে আসে জর্ডানের মাফরাক বিমান ঘাঁটির দিকে।

এবার তাদের লক্ষ্য জর্ডানের ছোট্ট বিমানবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। সে সময় ইসরাইলি সুপারসনিকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সমকক্ষ বিমান আরবীয়দের ছিল না। তবু ইসরাইলিদের ঠেকাতে মাফরাক বিমান ঘাঁটি থেকে ‘হকার হান্টার’ জঙ্গি বিমান নিয়ে বুক চিতিয়ে উড়াল দেন সাইফুল আজম।

আর সেই হকার হান্টার দিয়েই ক্ষিপ্রগতির দুটি ইসরাইলি সুপারসনিক ঘায়েল করে ফেললেন সাইফুল আজম। তার অব্যর্থ আঘাতে ভূপাতিত হয় একটি ইসরাইলি ‘সুপার মিস্টেরে’। আরেক আঘাতে প্রায় অকেজো হয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কোনো মতে পালিয়ে ইসরাইলি সীমানায় গিয়ে আছড়ে পড়ে আরেকটি বিমান।

সে দিন অকুতোভয় বৈমানিক সাইফুল আজমের অকল্পনীয় বীরত্বের কারণে ইসরাইলের পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়। উল্টো নিজেদেরই দুটো বিমান হারায় তারা। এমন বীরত্বের জন্য পুরস্কারস্বরূপ সাইফুল আজমকে ‘হুসাম-ই-ইস্তিকলাল’ সম্মাননায় ভূষিত করে জর্ডান সরকার। সাইফুল আজমের কাছে ইসরাইলি বৈমানিকদের ধরাশায়ী হওয়া পরদিনই তার কৃতিত্বে ইরাকি বৈমানিক দলের কাছে চরমভাবে পরাজিত হয় ইসরাইল।

৭ জুনে ইরাকের ‘এইচ-থ্রি’ ও ‘আল-ওয়ালিদ’ ঘাঁটি রক্ষা করার দায়িত্ব পড়ে এক ইরাকি বৈমানিক দলের কাঁধে। আর সাইফুল আজম সেই দলের অধিনায়ক। সে দিন চারটি ‘ভেটোর বোম্বার’ ও দু’টি ‘মিরেজ থ্রিসি’ জঙ্গি বিমান নিয়ে আক্রমণ চালায় ইসরাইল। একটি ‘মিরেজ থ্রিসি’ বিমানে ছিলেন ইসরায়েলি ক্যাপ্টেন গিডিওন দ্রোর। দ্রোরের গুলিতে নিহত হন আজমের উইংম্যান।

তার হামলায় ভূপাতিত হয় দুটি ইরাকি বিমান। পরক্ষণেই এর জবাব দেন আজম। তার অব্যর্থ টার্গেটে পরিণত হয় দ্রোরের ‘মিরেজ থ্রিসি’। সে আঘাতের পর বাঁচার উপায় না পেয়ে যুদ্ধবন্দি হিসেবে ধরা দেন ক্যাপ্টেন দ্রোর। ওই যুদ্ধবন্দির বিনিময়ে জর্ডান ও ইরাকের সহস্রাধিক সৈন্যকে মুক্ত করে ইসরাইল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টায় সাইফুল আজম একটি অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন।

ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভূপাতিত করেছেন সর্বোচ্চ তিনটি ইসরাইলি বিমান। যে জন্য তাকে ‘নাত আল-সুজাহ’ সামরিক সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। সাইফুল আজমই পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বৈমানিক যিনি চারটি দেশের বিমানবাহিনীর সৈন্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই চারটি দেশ হল পাকিস্তান, জর্ডান, ইরাক ও মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

এ ছাড়া আটটি ভিন্ন দেশের আট বাহিনীর বিমান পরিচালনা করেছেন আজম। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, জর্ডান, ইরাক, রাশিয়া, চীন ও নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশের হয়ে বিমান চালিয়েছেন তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে অনন্য সব অর্জন আর ইতিহাস গড়া সাইফুল আজমকে ২০০১ সালে ইউনাইটেড স্টেটস এয়ার ফোর্স বিশ্বের ২২ জন ‘লিভিং ইগলস’-এর একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার যে সব কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশকে গর্বিত করে সে সব ঘটনার কথা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। অনেকে হয়ত তার পরিচয়ও জানেন না। পাবনা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ারভাইস মার্শাল ফখরুল আজম তার ভাই।

কিংবদন্তি এই বীর বাঙালি প্রয়াত হয়েছেন গত বছরে। ২০২০ সালের জুনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর

আরো পড়ুন-বিশ্বনেতাদের মাজলুম ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানালেন শাইখুল আজহার

মাজলুম ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে বিশ্ববাসী ও বিশ্বনেতাদের তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানালেন সুপ্রাচীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মিশর আল আজহার