শ্মশানগুলোতে নিভছে না দাহের আগুন, করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা গোপন করছে ভারত

    করোনাভাইরানের দ্বিতীয় ঢেউ ক্রমেই ভারতকে একটি বিধ্বংসী সঙ্কটের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। অসহনীয়ভাবে জনাকীর্ণ হাসপাতালগুলি, অক্সিজেন সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি, চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করতে থাকা সুদীর্ঘ লাইনে করোনা মূমূর্ষদের মৃত্যু প্রমাণ করছে যে, দেশটিতে প্রকৃত করোনা মৃত্যুর সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত রিপোর্টে চেয়ে অনেক বেশি।

    ভারতে সরকারী হিসাবে প্রতিদিন ৩ লাখেরও বেশি নতুন সংক্রমণ ঘটছে, যা একটি বিশ্ব রেকর্ড। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই সংখ্যাটি যদিও আশঙ্কাজনক, কিন্তু এটি করোনা সংক্রমণের প্রকৃত মাত্রার মাত্র একটি অংশ উপস্থাপন করছে এবং প্রকৃত অবস্থা এই দেশটিকে জরুরি অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

    সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে হঠাৎ করোনার তীব্র বিস্তারে সম্ভবত এর একটি নতুন ও আরও মারাত্মক প্রজাতি বিশেষ ভূমিকা পালন করছে, যা ভারতের সরকারী নথিভুক্ত প্রায় ২ লাখ কোভিড-১৯ জনিত মৃত্যুর সংখ্যার বিষয়ে সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছে।

    শুধু সরকারী হিসেবেই দেশটিতে প্রতিদিন ২ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। দেশজুড়ে শ্মশানগুলোতে দাহের আগুন কখনও নিভছে না, যেগুলি সরকারী পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যুর চিত্র তুলে ধরছে।

    বিশ্লেষকরা বলেছেন যে, ভারতের রাজনীতিবিদরা এবং হাসপাতালগুলির প্রশাসকরা গদি বাঁচানোর তাগিদে এবং শোকগ্রস্ত পরিবারগুলি কোভিডের সাথে সম্পর্কিত থাকার লজ্জায় সম্ভবত সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর ঘটানাগুলি লুকাচ্ছেন এবং এই বিরাট দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের বিভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন।

    মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারী বিশেষজ্ঞ ভ্রমর মুখার্জি বলেছেন, ‘এটি সম্পূর্ণভাবে তথ্যের হত্যাযজ্ঞ। আমরা যে মডেলিং করেছি, তা থেকে আমরা বিশ্বাস করি যে, সংখ্যাটি যা রিপোর্ট করা হচ্ছে, মৃত্যুর প্রকৃত তার চেয়ে দুই থেকে পাঁচগুণ বেশি।’

    আহমেদাবাদের একটি বড় শ্মশানগুলির একটিতে কর্মরত সুরেশ ভাই মৃত্যুর কারণ হিসেবে করোনার উল্লেখ করেন না। তিনি জানিয়েছেন যে, করোনা মৃত্যুকে অসুস্থতাজনিত মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ তার কর্তাব্যক্তিরা তাকে এটা করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিদিন তার শ্মশানে ১৫ থেকে ২০ টি করোনা মৃতের দাহ করা হয়।

    এপ্রিলের মাঝামাঝি ১৩ দিনেরও বেশি সময় ধরে ভোপালের কর্মকর্তারা কোভিড-১৯ সম্পর্কিত ৪১ জন মারা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে শহরের প্রধান কোভিড-১৯ শ্মশান ও সমাধিস্থলগুলিতে যেখানে কঠোর প্রোটোকলের আওতায় মৃতদেহগুলোর সৎকার পরিচালিত হয়েছিল সেসব স্থানে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের-

    জরিপে একই সময়ে মোট ১ হাজারেরও বেশি মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ছত্তিশগড়ের দুর্গ জেলার কর্মকর্তারা ১৫ এপ্রিল থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ১ শ’ ৫০ টিরও বেশি কোভিড-১৯ এর মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন। টাইম্সকে দেয়া স্থানীয় গণমাধ্যগুলির পাঠানো বার্তা থেকে জানা গেছে, রাজ্যটি এই সংখ্যাটির অর্ধেকেরও কম সরকারী নথিভুক্ত করেছে।

    গুজরাটের শিল্প শহর সুরাটে শবদাহের জন্য ব্যবহৃত গ্রিলগুলি বিরামহীন ব্যবহৃত গ্রয়ার কারণে কোথাও কোথাও লোহাগুলি গলে গেছে। ১৪ এপ্রিল সুরাট ও গান্ধী নগরের কোভিড-১৯ জন্য নির্ধারিত শ্মশানগুলি থেকে দ্য টাইমসকে জানানো হয়েছে যে, তারা একদিনে ১ শ’ ২৪ জনের শবদাহ করেছে, যেখন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে, পুরো রাজ্যে কোভিড-১৯ ৭ ৩ জন মারা গেছেন।

    ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজ্য কানপুরে কয়েকটি পার্কে এখন শবদাহ করা হচ্ছে; শ্মশানে জায়গা নেই। একই ঘটনা লখনৌ এবং মির্জাপুরের বড় শহরগুলি এবং গুজরাট জুড়ে ঘটছে। গুজরাটের শ্মশান এবং

    সমাধিস্থলগুলিতে সাংবাদিকদের পাঠিয়ে রাজ্যটির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র সন্দেশের সংকলিত করোনা মৃত্যুর একটি বিশদ গণনা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, মৃত্যু সংখ্যাটি প্রতিদিন ৬ শ’ ১০ এর কাছাকাছি।

    ভারতের বৃহত্তমতম সংবাদপত্রগুলিও এই তারতম্যগুলি তুলে ধরেছে। ‘গুজরাটে কোভিড-১৯-এ মৃত্যু সরকারী পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি’ সম্প্রতি দ্য হিন্দুর প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম সেগুলি এভাবেই প্রকাশ পেয়েছে।

    কিছু বিশ্লেষকের মতে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে পরিচালিত ভারতীয় জনতা পার্টির নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলি দলীয় চাপে পড়ে তথ্য গোপন করছে। করোনার তথ্য প্রসঙ্গে ডক্টর মুখার্জি বলেন, ‘অগ্রগতি প্রদর্শন করার জন্য রাজ্যসরকারগুলির উপর কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র চাপ রয়েছে।,

    তিনি মোদির ২০১৯ সালে বেকারত্বের হার বৃদ্ধির চিত্র উপাত্ত লুকানোর কেলেঙ্কারীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, ঠিক এখনকার মতো করেই তখনও মোদির সরকার তথ্য গোপন করার চেষ্টা করেছিল। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস