ইসি একা কী করতে পারে!

ঢাকায় এক সেমিনারে নাগরিক সমাজের কয়েক বিশিষ্টজন বলেছেন, নির্বাচনে ভোটগ্রহণের মূল দায়িত্বে থাকেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেক্ষেত্রে সরকার, আমলা ও পুলিশ এক। ভোটগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতাও সীমাহীন। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) একা কী করতে পারে!

বিদ্যমান নির্বাচনব্যবস্থায় ইসি নিরপেক্ষভাবে চাইলেও তার একার পক্ষে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ভালো নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও নির্বাচনব্যবস্হার সংস্কার, একই সঙ্গে আমলাতন্ত্রকেও সরকারের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতে হবে। শনিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত ‘বর্তমান জাতীয় সংকট এবং সমাধানে নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে তারা এ কথা বলেন।

সেমিনারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, ইসি ইচ্ছা করলেই একটি ভালো নির্বাচন করতে পারবে না। এজন্য নির্বাচনব্যবস্হা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নির্বাচনে ভোটগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত সবাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। নির্বাচনে বেশির ভাগ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের। তাদের সিদ্ধান্ত উলটে দেওয়ার ক্ষমতা ইসির নেই। ভোটকেন্দ্রে আইনগত ক্ষমতা প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের।

তাদের সিদ্ধান্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা উলটে দিতে পারেন না। রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (জাতীয় নির্বাচনে) জেলা প্রশাসকেরা। আর প্রিজাইডিং কর্মকর্তা হন সরকারি ও এমপিওভুক্ত বেশির ভাগ শিক্ষক এবং ব্যাংক কর্মকর্তা। তারা জানেন পদে থাকতে হলে সরকারের কথাই শুনতে হবে। এই অবস্হা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আমলাতন্ত্রের ওপর সরকারের ক্ষমতা কমাতে হবে। ইসি একা কিছু করতে পারবে না।

তিনি বলেন, বর্তমানে সরকার এবং আমলা এক হয়ে গেছে। পুলিশ বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা তারা সব একত্রে কাজ করে। সুতরাং ইসি নিরপেক্ষ হলেও তারা একা কিছু করতে পারবে না। তিনি বলেন, অনুসন্ধান কমিটির ওপর সুশীল সমাজের নেতারা আস্হা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আমার কোনো আস্হা নেই। এর কারণ হচ্ছে, তারা সবাই দল করেন। আর যদি দলও না করেন তাহলেও কোনো কাজ হবে না। কারণ বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো নিরপেক্ষ লোক নেই। রাজনৈতিক দলগুলোরও সংস্কার করতে হবে। বেশির ভাগ দল গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতে বিশ্বাস করে না

আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশের কোনো নির্বাচন কমিশন আদৌ কোনো কাজ করে না। সার্চ কমিটিও কোনো কাজ করে না। আমাদের দেশের সিস্টেম যুক্তরাষ্ট্রের মতো করতে হবে। আর সেটা করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আমাদের সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনের ব্যবস্হা করতে হবে এবং আমলাতন্ত্রকে সরকারের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতে হবে। এটা করতে পারলে সরকার এবং আমলাতন্ত্র উভয়েই লাভবান হবে। তবে এ ধরনের সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়।

তিনি আরো বলেন, তিনটা, চারটা কিংবা পাঁচটা লোক দিয়ে ইসি গঠন করে নির্বাচন সুষ্ঠু করা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেকটা নির্বাচনে আইন অনুযায়ী ক্ষমতা দেওয়া থাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রিজাইডিং অফিসারকে। তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই কমিশনের।

সেমিনারে সভাপতিত্বকারী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, জনগণ এদেশের মালিক। ভোটাধিকার মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান অধিকার। এটি রক্ষা করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে যারা এই অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করতে চায়, তারাই সফল হয়ে যাবে। ভোটাধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষকে ভোটাধিকারের পাহারাদার হতে হবে। এজন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে, পাড়া-মহল্লায় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

সেমিনারে উপস্থাপিত লিখিত বক্তব্যে ড. কামাল বলেন, দেশ এখন সর্বগ্রাসী সংকটে নিমজ্জিত। রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে আজ ভগ্নদশা। জনগণের দাবি যখন নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা, তখন সরকার দেশের জাতির বিবেককে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য তড়িঘড়ি করে আইন প্রণয়ন করেছে একটি সার্চ কমিটি গঠনের জন্য, যা নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন বলে প্রচার করা জাতির সঙ্গে তামাশা ও এক মহাপ্রহসন মাত্র।

লিখিত বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, সরকারের দলীয়করণের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে শিক্ষাঙ্গনে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পেছনে করোনা মহামারির চেয়ে রাজনৈতিক কারণই ছিল মুখ্য।

সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে সরকার ফলাফল বেহাত করতে তিনটি কাজ করছে। সরকার অনুগত লোকদের নিয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে। এর মাধ্যমে একটি অনুগত ও মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে এবং পেপার অডিট ট্রেইল ছাড়া ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের মাধ্যমে আসল কারচুপি হবে। তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলে সেখানে ড. কামাল হোসেন বা আকবর আলি খানকে নির্বাচন কমিশনার করা হলেও ভোট সুষ্ঠু হবে না। সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গণফোরাম দলীয় সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান ও আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।