‘এক রাতেই রাস্তা বানাল জিন’, নেপথ্যে যে ঘটনা

ঢাকার ধামরাইয়ে এক রাতেই ‘জিন বানিয়েছে’ আস্ত সড়ক- এমন খবর জনমনে চাঞ্চল্য ছড়ায়। কেউ সেটাকে বলছেন গুজব, কেউবা বলছেন ‘বিশেষ মহলের’ গোপন তৎপরতায় তৈরি হয়েছে এই সড়ক। এবার ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্ত করেছে রাইজিংবিডি অনলাইন। আর তাতে বেরিয়ে এসেছে কথিত জিনের বানানো সড়কের নেপথ্যের ঘটনা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বালিয়া ইউনিয়নের প্রত্যাশা গেট-কামাড়পাড়া সড়কের প্রান্ত থেকে আমতা ইউনিয়নের বড়নারায়নপুর-ফাঁসি মার্কেট সড়কের প্রান্ত পর্যন্ত একটি চকের মধ্যে দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সড়কটির বড়নারায়ণপুর প্রান্তে আইপি গ্লোবাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কেনা জমির

সীমানা দেয়ালের কারণে মূল পাকা সড়কের সঙ্গে প্রায় ২০০-২৫০ ফুট সংযোগ সড়ক তৈরি করা যায়নি। এরিমধ্যে গত সোমবার রাতে সড়কের কয়েকশ গজ দূর থেকে কৃষি জমির পাশ দিয়ে সোজাসুজি আরেকটি সংযোগ সড়ক তৈরি করে। নির্মাণকারী অজানা থাকায় সড়কটিকে আখ্যা দেওয়া হয় ‘জিনের রাস্তা’ হিসেবে।

তবে সড়কটিতে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। কৃষি জমির ওপরের সড়কটির একপাশে দেখা গেছে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে সড়ক তৈরির ঘটনা। তবে কার তত্ত্বাবধানে সড়ক হলো সেটি জানাতে না পারলেও দুটি ভেকু দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকেই। এমনকি ভেকু দুটির মালিক বালিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও অপরটির মালিক স্থানীয় আব্দুল কাদের।

উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা জানান, প্রায় এক বছর আগে ২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩২০০ ফুট কাঁচা সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। এলাকাবাসী ও স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান জানান, প্রকল্প অনুমোদনের পর থেকেই স্থানীয় এক সাংবাদিক নিজের জমির পাশ দিয়ে সড়কটি নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন। তিনিই নতুন হওয়া সড়কটিকে ‘জিনের রাস্তা’ আখ্যা দিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেন।

স্থানীয় জমির মালিকরা বলছেন, বহুকাল ধরে তারা ওই চকে চাষবাস করে আসছেন। তাই চলাচলের সুবিধার্থে কামাড়পাড়া থেকে বড়নারায়ণপুর পর্যন্ত তুলনামূলক লম্বা আইল তৈরি করে নেন কৃষকরাই। পরবর্তীতে জনস্বার্থে ওই আইলেই কাঁচা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ইউনিয়ন পরিষদ। প্রথমে চকের মধ্যে দিয়ে সড়কটি সোজাসুজি সংযোগ করার কথা থাকলেও

‘ওই সাংবাদিকের’ জমি আইপি গ্লোবালের পাশাপাশি থাকায় তার সুবিধার্থে ঘুরিয়ে ওইদিক দিয়েই নেয়া হয়। সেটিই থেমে যায় আইপি গ্লোবালের সামনে গিয়ে। অতিরিক্ত ঘুরিয়ে নেওয়ায় অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার কোম্পানির কারণে সড়কটি পুরোপুরি শেষ করা যায়নি। এরিমধ্যে রাতের আঁধারে অগোচরে আগের প্রস্তাবিত সোজা অংশ দিয়ে মাটি কেটে সড়ক নির্মাণ করা হয়। এতে ফের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সড়ক নির্মাণের কারণে পরপর দুই বার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নান্দেশ্বরী গ্রামের কৃষক ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথমে চকের মধ্যে এটা আইল ছিলো। পরে সকলের সুবিধার জন্য একটি ৭-৮ ফুট রাস্তা বানানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। সেজন্য সাংবাদিক শামীম সবার অনুমতি চায়।

‘আমরা নিজেও জমি দিতে রাজি হই। কিন্তু প্রথমে যে দিক দিয়ে রাস্তা বানানোর কথা সেটা না করে রাতারাতি অন্য দিক দিয়ে সাপের মতো পেঁচিয়ে রাস্তা বানানো হয়। সেটা আমরা দেখিনি। এতে আমার জমির তিন পাশে প্রায় ১০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এরপর হঠাৎ করে গত ১৪ তারিখ রাতে আবার সেই পুরাতন মাপ নেয়া জায়গায় ভেকু দিয়ে ফসলসহ মাটি কেটে সোজাসুজি রাস্তা বানানো হয়।

এতেও আমার ৫ শতাংশের মতো জমি নষ্ট হলো। দুবারই আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। এবার তো কেউ স্বীকারই করছে না কে বানালো রাস্তা। চেয়ারম্যান, কৃষি কর্মকর্তা, মেম্বার সবাইকে জানিয়েছি। তারা বলেছেন, রাস্তা না চাইলে মাটি সরিয়ে ফেলতে। হঠাৎ করে এমন রাস্তা বানানোয় আমার ধান ও সরিষা ক্ষেতে অনেক লোকসান হলো।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই চকের দুই পাশে দুইটা রাস্তা আছে। এক পাশে ইটের সলিং আরেক পাশে পাকা রাস্তা। মূলত চকের মধ্যে আইল দিয়ে চাষবাসের ফসল নেয়া হতো। এখন শামীম খান নিজের জমি ফরোয়ার্ড করার জন্য ওই রাস্তা বানাইছে। ওখানে কোনো রাস্তা দরকারই ছিলো না।’

‘জিন রাস্তা বানিয়েছে’ কি-না এমন প্রশ্নে তিনি হেসে বলেন, এটা তো বাচ্চা পোলাপান দেখলেও বুঝবে ভেকু দিয়ে মাটি তুলে রাস্তা বানানো হয়েছে। শুনেছি দুইটা ভেকু রাত ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত মাটি কেটে রাস্তা বানিয়েছে।

আরেক বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, আগে তো মনে করেন এতো গাড়িঘোড়া ছিলো না। কামারপাড়া, বড় নারায়ণপুর, নান্দিসিড়ি গ্রামের প্রায় দুইশ মানুষের জমি আছে। দুই পাশের জমি কেটে রাস্তা নির্মাণ করছিলো আগের আহমদ চেয়ারম্যান। লম্বায় প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তার প্রায় পুরোটায় কমপ্লিট হয়ে গেছিলো।

কিন্তু শেষের দিকে আইসা প্রায় ২০০ ফুটের মতো রাস্তা বাকি ছিলো। যে অংশটুকু মেইন রাস্তায় সাথে এসে লাগার কথা ছিলো। পরে কিছুদিন আগে কোম্পানির বাউন্ডারির কাছে আইসা কাজ আটকে যায়।

বালিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আহমদ হোসেন বলেন, ‘ওখানে ঘটনা হলো কী; আসলে রাস্তা যে দিক দিয়ে নেয়া হইছে। কিন্তু ওখান দিয়া ছিলো না। রাস্তাটা সোজা বড় নারায়ণপুর রাস্তার সাথে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কামাড়পাড়ার সাংবাদিকের রিকোয়েস্টে আমি বাঁকা করে রাস্তাটা একটু ঘুরায় নিছিলাম।

ওর একটা জমি আছে ওইটার পাশ দিয়া নিছিলাম। কিন্তু একটা ফ্যাক্টরি জায়গা কিনছে, তারা মাঝখান দিয়া রাস্তা দিলো না। বাঁধা দেয়ার কারণে রাস্তাটার সংযোগ হলো না। ২০০-২৫০ রাস্তা ইনকমপ্লিট রাইখাই দুই-তিন দিন আগে আমি আইসা পড়ছি। কিন্তু ৩-৪ দিন আগে শুনলাম আগে সোজা যে দিক দিয়া রাস্তা হওয়ার কথা ছিলো ওই দিক দিয়াই রাত্রে বেলা নাকি কানেকশন দিছে। তবে কানেকশনটা কারা দিছে সেটা আমি সঠিক বলতে পারলাম না। কাউরে খুঁইজা পাওয়া যাচ্ছে না।’

রাতে যে দুইটা ভেকু দিয়া কৃষিজমির মাটি কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে তার মধ্যে একটি আপনার কি-না এমন প্রশ্নে বলেন, ‘তা আমি বলতে পারলাম না। তবে হতে পারে, আমি জানি না। আমার ভেকুর ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করব আমাকে না জানিয়ে সে গিয়েছিল কি-না।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাস্তা যেখান দিয়ে হয় ভালো। কিন্তু মানুষ চায় কি জানেন? তারা চায়, প্রত্যেকের জমির পাশ দিয়া রাস্তা হোক। আরও রাস্তা হলে সমস্যা তো নাই। আর যাদের জমি থেকে রাতে মাটি কেটে রাস্তা বানাইছে তাদের তো কোনো অভিযোগ নাই।’

ধামরাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলম বলেন, ‘এটা সরকারি বরাদ্দের রাস্তা। প্রায় দেড় কিলোমিটারের মতো। পত্রিকায় এটা নিয়ে একটা ফালতু, ভুয়া ও মনগড়া রিপোর্ট করছে। এই রাস্তার ব্যাপারটা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্যও নেয়া হয়নি।’

আইপি গ্লোবাল কারখানার প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তা হবে রাস্তার জায়গায়। আমাদের জায়গায় আমরা আছি। আমাদের সঙ্গে তো ওইটার কোনো সম্পৃক্ততা নাই।’