মাযহাব ইসলামকে বিভক্তি করেনি, বরং বিভক্তি থেকে বাঁচিয়েছে: মিযানুর রহমান আজহারী

মাযহাব নিয়ে মাওলানা মিযানুর রহমান আজহারীর মতামত জানতে চাচ্ছেন অনেকেই। সে বিষয়টিকে ক্লিয়ার করতে মাওলানা আজহারী দীর্ঘ একটি মতামত প্রকাশ করেছেন মাযহাব সম্পর্কে। কয়েক কিস্তিতে তার মতামতটি আওয়ার ইসলাম পাঠকের জন্য তুলে ধরা হচ্ছে। আজ থাকছে প্রথম কিস্তি-

‘মাযহাব ইসলামকে বিভক্তি করেনি বরং এটি ইসলামকে অনেক বিভক্তি থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর মাযহাবের মতভিন্নতার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যতগুলো আমল প্রমাণিত আছে; সবগুলোকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পুরো পৃথিবীতে জারি রেখেছেন।

মাযহাব কী? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলতে পারি, মাযহাব একটি আরবী শব্দ এর অর্থ হলো পথ বা মত কিংবা অভিমত অর্থাৎ ইমামদের গবেষণালব্ধ যে অভিমত সেটাকেই আরবিতে মাযহাব বলে। ইংরেজিতে যেটাকে বলে স্কুল অব থড। সংক্ষেপে বলা যায়, যে পথের গন্তব্য কুরআন এবং সুন্নাহ সেটাকেই মাযহাব বলে।

অনেক সময় এমন হয় যে, কুরআন এবং সুন্নাহতে বর্ণিত বিধিবিধানগুলো আমাদের বুঝতে কিংবা সেটা বুঝে আমল করতে সমস্যা হয়ে যায়; সেক্ষেত্রে যদি মাযহাবের যে পদ্ধতি আছে সে পদ্ধতিতে আমরা চলি; তাহলে আমাদের সেটা আমল করতে বা মানতে সহজ হয়ে যায়।

এ আলোচনার পর আমরা বলতে পারি যে, মাযহাব কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোন বিষয় নয় বরং এটি ইসলামের বিধি-বিধানগুলোকে সুবিন্যাস্ত আকারে মানুষের মাঝে তুলে ধরার একটি মাধ্যম। কুরআন এবং সুন্নাহর সবচেয়ে বিশুদ্ধ ব্যাখ্যায় হচ্ছে মাযহাবের ইমামদের সংকলিত থেকে ইসলামি ফিক্হ। আর এই ফিকহ শাস্ত্রের যে স্কুল অব থড সেগুলোকেই বেসিক্যালি মাযহাব বলা হচ্ছে।

প্রসিদ্ধ মাযহাব চারটি। হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী। আমরা জানি কোরআন এবং সুন্নাহতে বিক্ষিপ্তভাবে অনেক নিয়ম-কানুন এবং বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে যা আমাদের সেখান থেকে বোঝা অনেকটাই অসম্ভব। মাযহাব সেগুলোকে আমাদের মাঝে সুবিন্যাস্ত ভাবে তুলে ধরেছে।

যেমন ধরুন, নামাজের ফরজ কয়টি? বা নামাজের ওয়াজিব কয়টি? এটি কুরআন সুন্নাহর কোথাও বিন্যস্তভাবে পাওয়া যাবে না। আপনি বের করতে পারবেন না যে, নামাজের সুনির্দিষ্টভাবে ফরজ এতটি বা ওয়াজিব এতটি।

কিন্তু মাযহাবের ইমামগণ নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনেক গবেষনা করে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খোঁজার চেষ্টা করেছেন এবং হাজার হাজার মাসআলা ইসতেমবাত করেছেন; যা আমাদের জন্য ইসলামকে মানা এবং ইসলামের বিধি-বিধানগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে অনেকটা সহজ করে দিয়েছে। তাহলে আমরা বলতে পারি কুরআন এবং সুন্নাহর সারনির্যাসই হলো মাযহাব।

এখন প্রশ্ন হতে পারে মাযহাব একাধিক হওয়ার কারণ কি যেহেতু আমরা শুরুতেই বলেছি মাযহাব অর্থ মত বা অভিমত তাই প্রত্যেকের অভিমত একই রকম হবে এটা আসলে লজিক্যাল না। এটা যৌক্তিকও নয়। কেননা একেক জনের চিন্তা একেক রকম।

একেকজনের বুঝ একেক রকম। একেকরকম মতের ভিন্নতা বা চিন্তার ভিন্নতা এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। মানবজীবনে এটি একটি কমন বিষয়। এটা মানুষের মাঝে থাকবেই। এটাই মানুষের সহজাত। একারণেই ইসলামের বিভিন্ন বিধানের বিষয়ে কোরআন সুন্নাহ থেকে নির্গত মাযহাবগুলোর ক্ষেত্রে আমরা একাধিক মতামত পেয়ে থাকি।

তাছাড়া নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকেও একটি আমলের একাধিক পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো নামাজে বুকের উপর হাত বেঁধেছেন। কখনও একটু নিচে হাত বেঁধেছেন।

কখনো নাভির সঙ্গে মিলিয়ে একটু নিচে হাত বেঁধেছেন। কখনোবা তিনি নামাজের মধ্যে হাত বাঁধেননি; ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে সাহাবায়ে কেরাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসগুলোর একেকটিকে একেকজন গ্রহণ করেছেন।

যেমন কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম বুকের উপর হাত বাধার হাদিসকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম নাভির উপরে হাত বাধার হাদিসটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম নাভির সংলগ্ন নিচে হাত বাধার হাদিসটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন আবার কোন কোন সাহাবায়ে কেরাম আবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম যে মাঝে মাঝে হাত বাঁধতেন না; সে হাদীসটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।